চতুর্থত্রিশতম অধ্যায়: পারিবারিক শিক্ষক

আমি টোকিওতে তলোয়ারের সাধক হিসেবে বসবাস করছি। অসুর পথের শিষ্য 2586শব্দ 2026-03-20 07:02:13

কিমুরা কাজুকি আর কুবো নোরিয়ের পিতার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হওয়া নিয়ে আর ভাবেনি। এরপর সে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করল, কিন্তু কুবো নোরিয়ে যে উত্তর দিল, তাতে কিমুরা কাজুকির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কথাবার্তা থেকে বোঝা গেল, কুবো নোরিয়ে কোনো অদ্ভুত কিছু স্পর্শ করেনি। অবশ্য, কথোপকথনেরও সীমাবদ্ধতা আছে। হতে পারে, কুবো নোরিয়ে অসাবধানতাবশত কোনো কিছুর সংস্পর্শে এসেছে, অথচ সে নিজেই জানে না।

হাল ছেড়ে না দিয়ে কিমুরা কাজুকি জিজ্ঞেস করল, ‘‘তোমার আশপাশের কারও মধ্যে কি কোনো অদ্ভুত লক্ষণ দেখা গেছে?’’

কুবো নোরিয়ে খুব জানতে চেয়েছিল, কিমুরা কাজুকি কেন তার ব্যাপারে এতটা আগ্রহী, কিন্তু সে প্রশ্নটা গিলে ফেলল। একটু ভেবে বলল, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে আমার বাবা দিন দিন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছেন, খুবই ক্লান্ত দেখায়। জানি না, বাইরে কোথাও কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না।’’

বলতে বলতে সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল, ‘‘ভাগ্য最好, ও যেন কোনো নারীর বিছানাতেই মারা যায়!’’

কিমুরা কাজুকি আর জানতে চাইল না, কুবো নোরিয়ে কেন বাবাকে এতটা ঘৃণা করে। প্রত্যেক পরিবারেই ঝামেলা থাকে, এবং বাইরের কেউ বিনা কারণে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে পারে না।

তবে কিমুরা কাজুকির কুবো নোরিয়ের পারিবারিক বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু নোরিয়ের বাবার অস্বাভাবিকতা তার কৌতূহল জাগাল। ‘‘কখন থেকে এমন হচ্ছে?’’

‘‘মাসখানেক হবে…’’ কুবো নোরিয়ে অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘‘ভাবলে মনে হয়, সেই কাঠের ভাস্কর্যটাও মাসখানেক আগে কেউ বাবাকে দিয়েছিল। শুনেছি ওটা অনেক পুরোনো জিনিস, আফসোস, আমার হাতে ওঠেনি।’’

স্পষ্ট বোঝা যায়, কাঠের ভাস্কর্যটি নিয়ে কুবো নোরিয়ের এখনও আফসোস রয়েছে। তার খরচের জন্য খুব অল্প টাকা থাকে, অথচ খরচ করে ফেলে। আগেই যদি সে ভাস্কর্যটি চুরি করতে পারত, নিশ্চয়ই ভালো দাম পেত।

কাঠের ভাস্কর্য!

কিমুরা কাজুকি গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। একটু আগে কুবো নোরিয়ে বলেছিল, তিন দিন আগে সে একবার ভাস্কর্যটি চুরি করার চেষ্টা করেছিল, অর্থাৎ সে সেটির সংস্পর্শে এসেছে, অন্তত ছুঁয়েছিল। আর নোরিয়ের পিতা মাসখানেক ধরে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছেন, আর ওই কাঠের ভাস্কর্যটি মাসখানেক আগেই উপহার হিসেবে এসেছে।

সমস্যার সূত্রপাত স্পষ্ট।

এরপর কিমুরা কাজুকি নোরিয়েকে জিজ্ঞেস করল, সে সম্প্রতি কোথায় কোথায় গেছে, তা জানাতে। যদিও তার মন বলছে, সমস্যার উৎস কাঠের ভাস্কর্যটিতে, তবুও কিছু জায়গা নিজের চোখে না দেখে সে শান্তি পাচ্ছে না।

আর ঠিকই সামনের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি, তাই সে সময় করে কুবো নোরিয়ে যেসব জায়গায় গেছে, সেগুলো ঘুরে দেখতে পারবে।

এই তথ্যগুলো মনে গেঁথে নিয়ে সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কুবো নোরিয়ে একটু অবাক দেখাল, কিন্তু কিমুরা কাজুকি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে চাইল না।

‘‘সোমবার তোমার বাবাকে একবার স্কুলে নিয়ে এসো।’’

‘‘কি?’’ কুবো নোরিয়ে হতবাক হয়ে বলল, ‘‘আমি এখন ভালো হয়ে গেছি, তাহলে অভিভাবককে ডাকতে হবে কেন?’’

‘‘চিন্তা করো না।’’ কিমুরা কাজুকি সান্ত্বনা দিল, ‘‘এটা তোমার কারণে নয়, তোমার বাবার সঙ্গে আমার কথা আছে।’’

‘‘কথা বলার কিছু নেই, আমি ওকে কোনোভাবেই স্কুলে আসতে দেব না!’’ কুবো নোরিয়ে জেদ ধরে বলল, ‘‘স্কুল যদি জোর করে অভিভাবক ডাকে, তাহলে আমি সরাসরি স্কুল ছেড়ে দেব।’’

‘‘স্কুল ছাড়বে?’’ কিমুরা কাজুকি ঠাণ্ডা গলায় হেসে উঠল, ‘‘তাও তো পারো, তাহলে সোমবার তোমার বাবাকে নিয়ে এসো, স্কুল ছাড়ার কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে।’’

এই কথা শুনে কুবো নোরিয়ের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।

এ দেখে কিমুরা কাজুকি নিরাসক্তভাবে বলল, ‘‘তুমি যদি সত্যিই তোমার বাবাকে স্কুলে আসতে না দাও, সেটা তোমার ইচ্ছা। তবে যতদূর মনে পড়ে, তুমি তো উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের (৩) নম্বর শাখার ছাত্র… সেই শ্রেণিশিক্ষকের নাম তো ইনোয়ু স্যার, আমি ওনার সঙ্গে কথা বলব। এই সপ্তাহান্তে ইনোয়ু স্যার তোমার বাড়িতে যাবেন, কারণ তুমি ক্লাস শুরু হওয়ার পর কোনো ছুটি না নিয়েই প্রায় সপ্তাহখানেক পরে স্কুলে এসেছ, এটা বেশ গুরুতর ব্যাপার।’’

কুবো নোরিয়ের ঠোঁট কেঁপে উঠল, কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্লান্তভাবে বলল, ‘‘ঠিক আছে। তবে অন্তত আমাকে জানতে হবে, তুমি কী করতে চাও?’’

‘‘সেটা তখন তোমার বাবাকেই জিজ্ঞেস কোরো।’’ কিমুরা কাজুকি উত্তর দিল না। সময় দেখে বলল, ‘‘সোমবার তোমার বাবাকে পরিষ্কার কাপড় পরে আসতে বলবে।’’

এ কথা বলে সে আর কুবো নোরিয়ের দিকে তাকাল না, কী ভাবছে তাও ভাবল না। স্কুল ছুটির সময় দশ মিনিট হয়ে গেছে, অথচ তার আরও কাজ আছে, কারণ সাকুরা ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার কথা।

তাড়াতাড়ি কিমুরা কাজুকি শিক্ষকদের অফিসে চলে গেল। ভেতরে ঢুকতেই অনেক শিক্ষক হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন, সেও সবার দিকে হাসিমুখে সাড়া দিল।

‘‘এসেছো বুঝি,’’ সাকুরা হরুকো ওর জন্য একটা চেয়ারে বসতে দিল, তারপর টেবিলের ওপর থেকে কিছু খাতা ওর হাতে দিল, ‘‘এগুলো একটু দেখে দেবে?’’

কিমুরা কাজুকি আপত্তি করল না। সে চেয়ারে বসে খাতা খুলে দেখল, ওগুলো অঙ্কের প্রশ্নপত্র। দেখেই বোঝা গেল, স্কুল শুরু হওয়ার এক সপ্তাহও হয়নি, সাকুরা হরুকো উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষ (৫) শাখার ছাত্রদের একটা প্রাথমিক পরীক্ষা নিয়েছে।

কিমুরা কাজুকি আসার আগে সাকুরা হরুকো কিছু খাতা দেখেও ফেলেছে, তাই হাতে থাকা খাতা বেশি নয়, মাত্র কুড়িটির মতো। কিমুরা কাজুকি দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখল। যেহেতু সে সদ্য দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে, তাই প্রশ্নগুলো প্রথম বর্ষের পাঠ্যসূচির। তার জন্য এগুলো কোনো ব্যাপার নয়, কারণ সে খুব পরিশ্রমী ছাত্র।

মাত্র দশ মিনিটেরও কম সময়ে সে সব খাতা দেখে শেষ করল।

সাকুরা হরুকো খাতা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে, কয়েক মিনিট পরে মুখভরা প্রশংসা নিয়ে বলল, ‘‘অসাধারণ, তোমার পড়াশোনায় কোনো ঘাটতি নেই।’’

প্রশ্নপত্র সমাধান আর খাতা দেখা এক নয়, পরের কাজটা কঠিন। কিমুরা কাজুকি দশ মিনিটের মধ্যে বিশটির বেশি খাতা নির্ভুলভাবে দেখে শেষ করেছে, এটা তার দক্ষতার প্রমাণ।

‘‘তোমার জন্য যে কাজটা ঠিক করেছি, সেটা গৃহশিক্ষক হওয়ার,’’ সাকুরা হরুকো ডেস্ক গোছাতে গোছাতে বলল, ‘‘তোমার মতো ছাত্রের পক্ষে এই দায়িত্ব সামলানো কঠিন হবে না।’’

গৃহশিক্ষক?

কিমুরা কাজুকির মনে আনন্দের ঢেউ উঠল। চীন হোক বা জাপান, গৃহশিক্ষকের আয় মন্দ নয়।

বাড়িতে গিয়ে পড়ানো সাধারণত ঘণ্টা হিসেবে মজুরি হয়। তবু সে খুব বেশি খুশি হল না, কারণ সে তো কেবল ছাত্র, পেশাদার শিক্ষক নয়। তার ওপর, সাকুরা ম্যাডাম শুধু পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, অন্যপক্ষের অভিভাবক তাকে নেবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

এসব ভাবতে ভাবতে কিমুরা কাজুকি আবার শান্ত হয়ে গেল।

তারা দ্রুতই চলে এলেন প্রধান শিক্ষকের অফিসে। সাকুরা হরুকো হালকা শব্দে দরজায় টোকা দিল।

‘‘ভেতরে আসো,’’ এন্ডো এতোশি দরজা খুলে দু’জনকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘‘সাকুরা ম্যাডাম, আপনি কি কাজুকিকে নিয়ে এসেছেন, নাকি গৃহশিক্ষকের মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি করতে?’’

কিমুরা কাজুকি একটু অস্বস্তি বোধ করল। এন্ডো এতোশির মধ্যে কোনো কড়া ভাব নেই, বরং একেবারে সদয় এক বৃদ্ধের মতো, সব সময় হাস্যরস পছন্দ করেন।

‘‘প্রধান শিক্ষক, আজ এসেছি জানাতে, আমি এই গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব নিতে পারব না,’’ সাকুরা হরুকো হালকা হেসে বলল, ‘‘তবে আমি মনে করি কাজুকি এই কাজের উপযুক্ত, তাই তাকে নিয়ে এসেছি।’’

এন্ডো এতোশি একটু থেমে বললেন, ‘‘কেন?’’

‘‘আমার এক বান্ধবী একটি কোচিং সেন্টার খুলেছে, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আমাকেই যেতে হবে। তাই এই গৃহশিক্ষকের কাজটা আমি নিতে পারব না।’’

এন্ডো এতোশি অসহায়ের মতো হাসলেন, তারপর কিমুরা কাজুকির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘সত্যি বলতে, গুহাশি মহাশয় যখন তার মেয়েদের জন্য গৃহশিক্ষক খোঁজার অনুরোধ করেছিলেন, প্রথমেই তোমার কথা মনে এসেছিল। কিন্তু গুহাশি মহাশয়ের শর্ত ছিল, গৃহশিক্ষক হতে হবে নারী।’’

কিমুরা কাজুকি মাথা ঝাঁকাল, তার মনে কোনো হতাশা ছিল না। সে বলল, ‘‘তাহলে আমি এখনই বিদায় নিই।’’

‘‘আচ্ছা… একটু দাঁড়াও, এখনো আশা শেষ হয়নি,’’ এন্ডো এতোশি হেসে বললেন, ‘‘তুমি জানোই তো, সাকুরা স্কুলে নারী শিক্ষক খুব কম, এখন সাকুরা ম্যাডাম রাজি না হওয়ায়, আমি গুহাশি মহাশয়কে একটা ফোন করব, দেখি কী হয়।’’

প্রধান শিক্ষক ফোন করতে যাচ্ছেন দেখে সাকুরা হরুকো বিদায় নিলেন। কাজুকিকে পরিচয় করিয়ে দেবার কাজ তার শেষ, এরপর আর তার কিছু করার নেই।

কিমুরা কাজুকি সাকুরা হরুকোকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল, তারপর সোফায় বসে চুপচাপ প্রধান শিক্ষকের ফোনালাপের অপেক্ষায় থাকল।

প্রধান শিক্ষকের কথা শুনে বোঝা গেল, এটা গুহাশি পরিবারের ব্যাপার।

যদি গুহাশি পরিবারই হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সেই চতুরঙ্গ বোনেরা।